শুধু দেশ ও জনগণের পক্ষে JNEWS24TV.COM
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
কৃষকের জন্য সরকারি বরাদ্দ দেওয়া সার ডিলারের গুদামে পৌঁছানোর আগেই হাতবদল হয়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় চলে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে জামালপুরের মেলান্দহ বিএডিসি গোডাউনকে ঘিরে। নিবন্ধিত ডিলারের প্যাড ব্যবহার করে সার উত্তোলনের পর তা অন্য জেলার বাজারে চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ডিলার।
ডিলারদের অভিযোগ, সার উত্তোলনের ক্ষেত্রেও তাদের কাছ থেকে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। আমদানি করা বিভিন্ন সারের ক্ষেত্রে বস্তাপ্রতি ২০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। টাকা না দিলে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও সার পেতে নানা অজুহাতে দিনের পর দিন ঘোরানো হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার উত্তোলন থেকে শুরু করে তা অন্যত্র বিক্রি—পুরো প্রক্রিয়ায় একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সেপ্টেম্বরে বরাদ্দ ১১৮২ টন টিএসপি, ডিএপি ২১১১ টন
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে জামালপুরের ২৬৪ জন ডিলারের জন্য মেলান্দহ বিএডিসি গোডাউন থেকে ১ হাজার ১৮২ মেট্রিক টন বিএডিসি টিএসপি এবং ২ হাজার ১১১ মেট্রিক টন ডিএপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে আমদানি করা ডিএপি ১ হাজার ৭৩৫, বাংলা ডিএপি ২৩৮ এবং বিএডিসি ডিএপি ১৩৮ মেট্রিক টন। এ ছাড়া বিএডিসি এমওপি বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ৭৭২ মেট্রিক টন।
জেলায় বিপুল পরিমাণ সার বরাদ্দ থাকলেও তা যথাসময়ে কৃষকের কাছে পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সার উত্তোলন ও পরিবহন ব্যবস্থার বিভিন্ন ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে।
এক গাড়িতে কয়েক ডিলারের সার
মেলান্দহ বিএডিসি গোডাউন থেকে জামালপুর সদরের ৬৫, সরিষাবাড়ীর ৫২, মেলান্দহের ৪৫, ইসলামপুরের ২৫, মাদারগঞ্জের ২৬, বকশিগঞ্জের ২৪ এবং দেওয়ানগঞ্জের ২৭ জন ডিলার সার উত্তোলন করেন।
ডিলারদের অভিযোগ, একজন ডিলারের নামে ২০-৩০ বা তার কমবেশি বস্তা সার বরাদ্দ হওয়া এবং পরিবহন সংকটকে কাজে লাগিয়ে তিন থেকে পাঁচজন ডিলারের বরাদ্দ এক গাড়িতে উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে কোন ডিলারের কত সার কোথায় যাচ্ছে, তার হিসাবের গরমিলের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ডিলারের প্যাড সংগ্রহ করে একটি নির্দিষ্ট চক্র সার উত্তোলন করছে। পরে সেই সার জামালপুরের কৃষকের পরিবর্তে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার বাজারে চলে যাচ্ছে।
‘সার বিক্রি না করলে পরের মাসের বরাদ্দে সমস্যা’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ডিলার অভিযোগ করেন, মেলান্দহ বিএডিসি গোডাউনকেন্দ্রিক একটি চক্রের কাছে সার বিক্রি না করলে পরের মাসের বরাদ্দ পেতে সমস্যায় পড়তে হয়। ফলে অনেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওই চক্রের সঙ্গে সমঝোতা করেন বলে দাবি তাদের।
এক ডিলারের ভাষ্য, ‘বরাদ্দ আমাদের নামে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে।’
আরেক ডিলার বলেন, ‘সার নিতে গেলে একদিকে টাকা দিতে হয়, অন্যদিকে নির্দিষ্ট লোকের সঙ্গে সমঝোতা না করলে সার পেতে ভোগান্তি হয়। প্রতিবাদ করলে পরের মাসের বরাদ্দ নিয়ে ভয় থাকে।’
গোডাউনে টাকা নিয়ে দর-কষাকষির অভিযোগ
সম্প্রতি মেলান্দহ বিএডিসি গোডাউনে সরেজমিনে গিয়ে পাঁচটি নছিমনে সার লোড করতে দেখা যায়। সেখানে ডিলার প্রতিনিধি ও ক্যাটিম্যানের মধ্যে টাকা নিয়ে দর-কষাকষি হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে গাড়িপ্রতি ১৫০ টাকা দেওয়ার পর পাঁচটি গাড়িতে সার লোড করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
কয়েকজন ডিলারের অভিযোগ, এর আগে সার ডেলিভারি নেওয়ার সময়ও বস্তাপ্রতি আলাদা টাকা দিতে হয়েছে।
তাদের দাবি, মরক্কো থেকে আমদানি করা টিএসপি, সৌদি আরব থেকে আমদানি করা ডিএপি এবং রাশিয়া থেকে আমদানি করা এমওপি বস্তাপ্রতি ২০ টাকা এবং তিউনিসিয়া থেকে আমদানি করা টিএসপি বস্তাপ্রতি সর্বোচ্চ ১২০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে।
সাত ডিলারের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অনুসন্ধানে সাদিয়াতুন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী পরাণ (বাউসী), মাসুদ কুটের বাজার (মেলান্দহ), আবিদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ভুট্টা (শিমুলতলী বাজার), কবির ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সেলিম (মেলান্দহ বাজার), রাফিন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা (মেলান্দহ) এবং আল মিজান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শাহীন (মালগুদাম, জামালপুর সদর)—এই ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সার কালোবাজারি চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া গোডাউনে কর্মরত তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও চক্রটিকে সহযোগিতা করার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ডিলার।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘উত্তরবঙ্গে সার বিক্রির সুযোগ নেই’ অভিযোগের বিষয়ে আল মিজান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শাহীন বলেন, চলতি মাসে তার প্রতিষ্ঠানের নামে ৪৩ বস্তা টিএসপি, ৫৬ বস্তা ডিএপি এবং ৬০-৭০ বস্তা এমওপি বরাদ্দ হয়েছে।
এ পরিমাণ সার দিয়ে এলাকার কৃষকদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘উত্তরবঙ্গে সার বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। আমরা অন্য জায়গা থেকে সার কিনে এনে কৃষকের চাহিদা পূরণ করি।’
আবিদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ভুট্টা জানান, চলতি মাসে তার নামে ১৭৫ বস্তা ডিএপি, ৬০ বস্তা টিএসপি ও ১০৩ বস্তা এমওপি বরাদ্দ হয়েছে। উত্তরবঙ্গে সার কালোবাজারে বিক্রির বিষয়ে তিনি তেমন কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
সাদিয়াতুন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী পরাণের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অভিযোগের বিষয়ে বিএডিসির বক্তব্য মেলান্দহ বিএডিসির উপপরিচালক শওকত আলীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অফিসের কাজে বাইরে আছি। অফিসে আসুন, বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কথা হবে।’
বস্তাপ্রতি ২০ থেকে ১২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে অফিসে গিয়ে কথা বলার জন্য প্রতিবেদককে বলেন।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) পরিচালক চান মিয়া চানু বলেন, বিএডিসির নিবন্ধিত ডিলাররা বিএফএর সদস্য না হওয়ায় বিএডিসির সার বিতরণে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। জামালপুরের ডিলারদের বরাদ্দ করা সার কীভাবে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে, তা প্রশাসনের নজরে আনা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কৃষকের সার, যাচ্ছে কার হাতে? সরকার কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করছে। সেই সার যদি ডিলারের গুদামে পৌঁছানোর আগেই অন্যত্র চলে যায়, তাহলে সরকারি বরাদ্দের সুফল কৃষক কতটা পাচ্ছেন—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
মেলান্দহ বিএডিসি গোডাউন ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে, তা শুধু সার কালোবাজারির ঘটনা নয়; সরকারি বরাদ্দ, উত্তোলন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সংঘবদ্ধভাবে সার অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসবে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
